মঙ্গলবার, ২৮ মে, ২০১৩



অ্যাডভেঞ্চার............ 

মা মেয়ে মিলে বেরিয়ে পড়লাম সকাল বেলায় – যেন একটা অ্যাডভেঞ্চার । গলির মোর থেকে অটো করে বিরাটী স্টেশন । টিকিট কেটে পৌঁছোতে না পৌঁছোতেই শিয়ালদাগামী ট্রেন এসে গেল। অফিস টাইমের ভীড় । মহিলা কামরাতে অসম্ভব ঠেলাঠেলি। উঠতে না পেরে পাশের ভেন্ডারটাতেই উঠে পড়লাম। সেখানে সারি সারি দুধের ক্যান – তার উপর মানুষ বসে। কেউ বা ঝিমোচ্ছে, কেউ বা দেশচর্চায় ব্যস্ত। কয়েকজন মিলে এক জায়গায় তাস-ও খেলছে। একদল খোল-করতাল নিয়ে হরিনাম সংকীর্তনে মেতেছে। তাইতে একদল কম বয়সী ছেলে ডিস্কো নাচের তাল দিচ্ছে । সে এক অভাবনীয় দৃশ্য। আমরা কোনরকমে জায়গা করতে করতে সৌভাগ্যবশতঃ বসার জায়গা পেয়ে গেলাম।
বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হল......... আরে! আমি তো একটা বিচ্ছিরি ভুল করে বসে আছি। জয়নগরের বদলে স্মার্টলি ডানকুনির টিকিট কেটে বসে পড়েছি। বেশ আনন্দে ছিলাম যে সোজাসুজি বিরাটী থেকে জয়নগরের টিকিট কেটে নিয়েছি, বেশ নিশ্চিন্ত। কিন্তু কি করে যে এত নিশ্চিত হয়ে কাউন্টার থেকে  ডানকুনির টিকিট কাটলাম ভেবে পেলাম না। নিজের ছাগলামির উপর নিজের-ই বিরক্ত লাগল, তারপর হাসাহাসি আর কি।
শিয়ালদা তো পৌঁছনো গেল। এবারে ঠিকঠাক জয়নগরের টিকিট কাটলাম। কোন ট্রেনে চড়তে হবে কিছুই জানি না। একজন বললেন লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল ধরতে। কিন্তু তখন সবে সাড়ে নটা বাজে আর লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল ছাড়বে এগারোটা কুড়িতে। অতোক্ষণ সময় নষ্ট হবে? তাই আবার ছুটলাম অনুসন্ধান অফিসে। সম্ভ্রান্ত দেখতে একজন ভদ্রলোক বসেছিলেন কাউন্টারে। জিজ্ঞেস করলাম... দাদা, জয়নগর যেতে কোন ট্রেনে উঠব? উনি বললেন...... কোন জয়নগর? বিহারের জয়নগর নাকি বাংলার? (ভাবলাম...... একি? অবাক জলপানের মত অবস্থা হতে চলেছে নাকি? ) আমি বললাম... না না, বাংলার। তখন উনিও লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল-এর কথা বললেন। আমি জানতে চাইলাম আগের আর কোন ট্রেন নেই? উনি বললেন...... তাহলে বালিগজ্ঞ চলে যান। ওখানে দশটা চব্বিশে নামখানা লোকাল ধরে নেবেন।
আমরা তাড়াহুড়ো করে লোকজনদের জিজ্ঞেস করে বারুইপুর লোকালে উঠে পরলাম... এবার মহিলা কামরা বেশ ফাঁকাই ছিল। পার্ক্সট্রীট-এর পরেই বালিগজ্ঞ। বেশ তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলাম। তারপর প্ল্যাটফর্ম পালটে নামখানা  লোকালের জন্য অপেক্ষা। যথাসময়ে মহিলা কামরা তে উঠে দুজনে দুটো বসার জায়গা পেয়ে বসে গেলাম নিশ্চিন্তে।
ক্রমশঃ ট্রেনে ভীড় বারছে। আমরা নিশ্চিন্তে বসে আছি। পরের পর স্টেশনের নামগুলো পড়তে পড়তে চলেছি। আমাদের সামনে একজন মেয়ে জায়গা আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাকে বলে রেখেছি জয়নগর স্টেশন আসলে আমাদের যেন বলে। ভাবলাম আমরা উঠে গেলে বসবে বলে হয়তো জায়গা আগলে দাঁড়িয়ে আছে। একের পর এক স্টেশন পেরিয়ে যখন বারুইপুর এল, তখন ওই মেয়েটি বলল – এবার উঠুন। আমি বললাম – কিন্তু জয়নগর তো এখন অনেক দেরি! মেয়েটি বলল – হ্যাঁ, আপনি উঠুন, আমি এবার বসব। আমি তো শুনে হাঁ। কমবয়সী একটি মেয়ের এ কি ধরনের কথা? বললাম – আমি প্রথম থেকে জায়গা পেয়ে বসতে পেরেছি বলেই যাচ্ছি এই ট্রেনে। আমি আপনাকে কেন জায়গা ছেড়ে দেব? সে বলল – এটাই এই লাইনের নিয়ম। আমি আপনার সামনে দাঁড়িয়েছি, আপনাকেই উঠতে হবে। বললাম – আমি অনেক জায়গায় অনেক ট্রেনে চড়েছি, এরকম নিয়ম কখনও শুনিনি। আপনি আমাকে লিখিত নিয়ম দেখান, নয়তো আপনার নিয়ম আমি শুনতে জাচ্ছি না। এই বলে চেপে বসে রইলাম। আর খুব সত্যি কথা... ঐ ভীড়ে আমার বা মেয়ের কারোর পক্ষেই দাঁড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ওর তো এমনি বেশী ভীড়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার  প্রবণতা। তবু খানিক বাদে যখন একজন বৃদ্ধা ওর সামনে এসে দাঁড়ালেন, তখন ও উঠে ওনাকে বসতে দিল। তারপর একজন মহিলা ছোট বাচ্ছা নিয়ে দাঁড়াতে পারছিলেন না, তাকেও বসতে দিল। মনুষ্যত্ব ছাড়া তো মানুষ হয় না! ইতিমধ্যে প্রচুর প্যাসেঞ্জার উঠছে নামছে। অনেক বসার জায়গাও খালি হচ্ছে। আর আমার সামনের মেয়েটিও অনেক আগেই একটা বসার জায়গা পেয়ে ঘুমের অতলে ডুবে গেছে। যা হোক, খানিকটা তিক্ত মন নিয়েই জয়নগর স্টেশনে নামা গেল।
    প্রথমেই টিকিট কাউন্টারে ফেরার ট্রেনের টাইমগুলো জেনে নিলাম। তারপর পায়ে পায়ে এগিয়ে চললাম অটো স্ট্যান্ড-এর দিকে। যেতে হবে নিমপিট রামকৃষ্ণ মিশনের কাছে। যেতে যেতে চোখে পড়ল দোকানে দোকানে মোয়ার সম্ভার। এই সেই বিখ্যাত জয়নগরের মোয়া। কারিগরেরা বানিয়ে চলেছে মোয়া আর নতুন গুড়ের গন্ধে চারপাশ ম ম করছে।
    অটোতে চড়ে চলে এলাম নিমপিট। মিশনের উল্টোদিকেই Vivekananda Institute of Biotechnology. সেখানে মিঃ ও মিসেস বাসুর সাথে কথা হল গঙ্গাসাগরের প্রজেক্টের ব্যপারে। তারপর ওনাদের নিমন্ত্রণে ওখানকার ক্যান্টিনেই মধ্যাহ্ণভোজন করতে হল। মাছ, মাংস, চাটনি, পায়েস – এলাহি ব্যপার।
    খেয়ে-দেয়ে রামকৃষ্ণ মিশনটা একটু ঘুরে দেখে ফেরার অটো ধরলাম। যথাসময়ে ট্রেন এল। এবারে ফাঁকা কামরা। জানলার ধারে বসে স্টেশনের নাম দেখতে দেখতে এগিয়ে গেলাম। এবারে আর শিয়ালদা নয়। নামলাম বালিগঞ্জ স্টেশনে। রাস্তায় উঠে এয়ারপোর্টের ভলভো ধরে নিলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। অবসন্ন দেহ জানলায় ঠেসান দিয়ে ঝিমোতে ঝিমোতে পৌঁছে গেলাম মায়েতে মেয়েতে নিজেদের ডেরায়।
***********

1 টি মন্তব্য: